AI দিয়ে দ্রুত গাড়ি বানাচ্ছে General Motors
ছবিঃ General Motors
গাড়ি তৈরির প্রক্রিয়া আরো দ্রুত করার উপায় খুঁজে পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের General Motors (GM)। সমাধানটা সহজ—কাজের বড় অংশ কম্পিউটারের হাতে ছেড়ে দেওয়া।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও সিমুলেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে গাড়ি উন্নয়নের কর্মপরিকল্পনার জন্য প্রয়োজনীয় স্বাভাবিক সময় প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত GM Forward আয়োজনে GM-এর প্রধান পণ্য কর্মকর্তা (Chief Product Officer) Sterling Anderson প্রচলিত উন্নয়নপ্রক্রিয়াকে রিলে রেসের সঙ্গে তুলনা করেন। এখানে ডিজাইনাররা স্কেচ তুলে দেন প্রকৌশলীদের হাতে, এরপর প্রকৌশলীরা নকশা পাঠান উৎপাদন বিভাগের কাছে।
তিনি বলেন, “এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়া এবং এর বিভিন্ন ধাপের মধ্যে বারবার পরিবর্তন আনতে শিল্পখাতের গড়ে চার থেকে পাঁচ বছর সময় লাগত।”
GM এখন এই পদ্ধতির বদলে ‘concurrent engineering’ ব্যবহার করছে। এতে উন্নয়নের বিভিন্ন ধাপ একই সময়ে চালানো হয়। GM-এর ভার্চুয়াল ইন্টিগ্রেশন বিভাগের নির্বাহী পরিচালক Jason Fischer এই পরিবর্তনের লক্ষ্য ব্যাখ্যা করেছেন।
Fischer বলেন, “এই কার্যপদ্ধতি আমাদের দুই বছরে গাড়ি তৈরি করতে দেবে, যেখানে প্রচলিত পদ্ধতিতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি সময় লাগে।”
GM অবশ্য একা এই পথে হাঁটছে না। Nissan-ও তাদের আসন্ন Skyline তৈরিতে AI-এর সাহায্য নিয়েছে। এতে উন্নয়নের সময় কমে হয়েছে অর্ধেক। অন্যদিকে চীনা গাড়ি নির্মাতারা বহু বছর ধরেই ভার্চুয়াল পরীক্ষা ও সিমুলেশনের ব্যাপক ব্যবহার করছে। অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়নের একেবারে শেষ ধাপে গিয়ে তারা বাস্তব গাড়ি দিয়ে পরীক্ষা চালায়।
GM-এর নিজস্ব ফলাফলও দেখাচ্ছে, এই কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। গাড়ির বায়ুগতিবিদ্যা (aerodynamics) পরীক্ষা করতে ব্যবহৃত প্রচলিত Computational Fluid Dynamics (CFD) সিমুলেশন শেষ হতে সময় লাগে ৬০ ঘণ্টা। ফলে প্রকৌশলীরা প্রতিবার শুধু একটি নকশা নিয়েই কাজ করতে পারেন। তার পরিবর্তে GM এখন ব্যবহার করছে তাদের নিজস্ব মেশিন লার্নিং টুল, যা প্রতিষ্ঠানটির কয়েক দশকের সম্মিলিত তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষিত। Anderson-এর ভাষায়, এটি মাত্র ৬০ সেকেন্ডে এমন ফলাফল দেয়, যা “CFD-এর সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে মিলে যায়”।
একইসাথে দ্রুত হয়েছে ব্যাটারি উন্নয়নের কাজ। GM-এর নতুন lithium manganese-rich (LMR) ব্যাটারি সেল পরীক্ষা করতে প্রথাগত পদ্ধতিতে প্রয়োজন হয় ৬০ হাজার ঘণ্টারও বেশি সময়। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় দলটি কাজটি শেষ করেছে মাত্র ২৫৬ ঘণ্টায়। ব্যাটারির প্যাকের প্রাথমিক ধারণা থেকে আনুষ্ঠানিক প্রকল্প অনুমোদন করতে সময় লেগেছে এক মাসেরও কম।
এছাড়া, AI-এর সহায়তায় মাত্র এক-তৃতীয়াংশ সময়ে ২০২৭ Chevrolet Silverado-এর নতুন V8 ইঞ্জিনটি তৈরি করেছে তারা। তাদের ভার্চুয়াল পরীক্ষার সরঞ্জাম প্রায় ১০০ দিনের পরীক্ষার তথ্যকে বিশ্লেষণ করতে পারে মাত্র এক দিনে। বাস্তব প্রোটোটাইপ তৈরির আগেই প্রকৌশলীরা ড্রাইভার-ইন-দ্য-লুপ সিমুলেটরে ঠিক করে নিতে পারেন পাওয়ারট্রেন, স্ট্যাবিলিটি কন্ট্রোল, ABS এবং তাপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সেটিং।
এই প্রযুক্তির সুবিধা শুধু উন্নয়ন খরচ কমানোতেই সীমাবদ্ধ নয়। রাস্তায় পরীক্ষার সময় Chevrolet- এর Corvette ZR1 গাড়িটি সর্বোচ্চ ২৩১ মাইল (৩৭২ কিমি) গতি অর্জন করেছিল। কিন্তু GM-এর ভার্চুয়াল মডেল বলছিল, গাড়িটি আরও দ্রুত চলতে পারবে। ঘণ্টায় প্রায় ২৩৩ মাইল (৩৭৫ কিমি) সর্বোচ্চ গতির পূর্বাভাস দেয় মডেলটি। প্রকৌশলীরা রাতারাতি পাওয়ারট্রেনের সেটিং পরিবর্তন করেন। পরদিনই গাড়িটি অর্জন করে ঘণ্টায় ২৩৩ মাইল।
Fischer বলেন, “এর অর্থ হলো, আমাদের ভার্চুয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং আগে থেকে জানা বিষয়গুলো নিশ্চিত করছে এবং শেষ পর্যায়ে প্রকৌশলীদের গাড়িকে আরও নিখুঁত করার সুযোগ দিচ্ছে। ফলে উন্নয়নের একেবারে শেষ দিকে গিয়ে সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে না।”
শুধু চলতি বছরেই যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণা, উন্নয়ন ও উৎপাদন খাতে ১৬ বিলিয়ন ডলারের (প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা) বেশি বিনিয়োগ করেছে GM। তবে কোম্পানির ঘোষণায় এই পুরো অর্থ যে AI-সংক্রান্ত কাজেই ব্যয় করা হচ্ছে, এমন কোনো ইঙ্গিত নেই।
গাড়ি উন্নয়নের বাহিরে, Digital twin প্রযুক্তির মাধ্যমে বাস্তব যন্ত্রপাতি বসানোর আগেই কারখানার বিন্যাস পরীক্ষা করতে পারেন প্রকৌশলীরা। Anderson জানিয়েছেন, GM এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে, যা মাত্র আধা সেকেন্ডে একটি রোবটের গ্রিপ বা কোনো বস্তু আঁকড়ে ধরার সক্ষমতা পরীক্ষা করতে পারে। নতুন প্রযুক্তিতে ব্যাটারি প্যাক সংযোজনের সময়ও কমে এসেছে প্রায় ৩০ শতাংশ।
পাশাপশি নতুন মডেলের অপেক্ষা না করেই ভবিষ্যতে নতুন ফিচার যোগ করার প্রস্তুতিও নিচ্ছে GM। প্রতিষ্ঠানটির বৈশ্বিক EV আর্কিটেকচারের পরিচালক Zach Walker জানিয়েছেন, ২০২৮ সাল থেকে GM-এর আসন্ন গাড়ির কেন্দ্রীয় কম্পিউটার ব্যবস্থা গাড়ির পুরো জীবনকালজুড়ে over-the-air আপডেটের মাধ্যমে নতুন ফিচার যুক্ত করার সুযোগ দেবে।
শুনতে তাক লাগানো হলেও এই সকল বিষয়গুলো অবশ্য নতুন কিছু নয়। অনেক চীনা গাড়ি নির্মাতা সফটওয়্যার ও গাড়ির নকশা তৈরিতে ইতিমধ্যেই ব্যাপকভাবে নির্ভর করছে সিমুলেশনের ওপর। পরে বাস্তব পরীক্ষার মাধ্যমে সেই কাজ যাচাই করা হয়।
উল্লেখ্য, এই পদ্ধতি নিখুঁত নয়। অনেক সময় বাস্তব পরীক্ষায় যে সকল ত্রুটি ধরা পড়ে, সিমুলেশন ব্যবহার করলে তা ফসকে যেতে পারে। তারপরও এ প্রযুক্তি চীনা নির্মাতাদের এতই দ্রুত নতুন মডেল বাজারে আনতে সাহায্য করছে যে তার সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে পশ্চিমা নির্মাতারা।
GM ও তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা যদি নির্ভরযোগ্যভাবে এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে, তাহলে AI এই বিশাল ব্যবধান কমাতে সাহায্য করবে। প্রচলিত গাড়ি নির্মাতারা যদি চার-পাঁচ বছরের বদলে দুই বছরে মধ্যেই নতুন গাড়ি বাজারে আনতে পারে তবে তারা চীনের ক্রমবর্ধমান গাড়িশিল্পের সঙ্গে তাল মেলাতে পারবে।
তবে মুদ্রার একটা ওপিঠ রয়েছে। অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের কাজ যখন AI মাত্র কয়েক মিনিটেই করে দিচ্ছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—এত বিশাল কর্মীবাহিনীর আসলেই কোনো প্রয়োজন আছে কি না? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাত ধরে গাড়ি হয়তো দ্রুত তৈরি হবে, কিন্তু এই খাতের সব কর্মীর ভবিষ্যৎ যে সুরক্ষিত থাকবে—তা বলা মুশকিল।
গাড়ি তৈরির প্রক্রিয়া আরো দ্রুত করার উপায় খুঁজে পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের General Motors (GM)। সমাধানটা সহজ—কাজের বড় অংশ কম্পিউটারের হাতে ছেড়ে দেওয়া।