ইউরোপজুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে চীনের গাড়ি নির্মাতারা। আর এতে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বড় কয়েকটি গাড়ি নির্মাতা।
কম দামে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার পাশাপাশি ক্রমেই প্রতিযোগিতামূলক পণ্য নিয়ে বাজারে জায়গা করে নিচ্ছে চীনা ব্র্যান্ডগুলো। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বড় গাড়ি নির্মাতাদের প্রতিনিধিত্বকারী একটি সংগঠন দেশটিতে চীনা গাড়ির ওপর স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য সরকারকে চাপ দিচ্ছে।
ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানির ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর রয়েছে। এর পাশাপাশি তথ্য সংগ্রহ ও জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত কঠোর বিধিনিষেধের কারণে চীনা নির্মাতাদের পক্ষে মার্কিন বাজারে গাড়ি বিক্রি করা এখন একপ্রকার অসম্ভব। অথচ 'Alliance for Automotive Innovation'—নামের সাথে যাদের বর্তমান দাবির এক অদ্ভুত বৈপরীত্য রয়েছে—এখন চাচ্ছে আইনপ্রণেতারা যেন এই অস্থায়ী বিধিনিষেধগুলো চিরতরে স্থায়ী করে দেন।
Reuters-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, লবিং গ্রুপটি তাদের প্রচারণার প্রধান কারণ হিসেবে “চীনের অন্যায্য আচরণের ধারাবাহিকতা” এবং জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকির কথা তুলে ধরছে। সংগঠনটি মূলত বেশ কয়েকটি গাড়ি নির্মাতা ও যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করে এবং তাদের পক্ষে কেন্দ্রীয় আইনপ্রণেতাদের কাছে ওকালতি করে আসছে। এর CEO John Bozzella ইউরোপে চীনা গাড়ি বিক্রির দ্রুত বৃদ্ধিকে সতর্কবার্তা হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর আশঙ্কা, চীনা নির্মাতারা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পেলে সেখানেও একই পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
খবরে বলা হচ্ছে, ইউরোপজুড়ে চীনা প্রতিযোগিতা নিয়ে উদ্বিগ্ন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে General Motors, Volkswagen এবং Toyota। প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ইউরোপের ক্রেতারা ১০ লাখেরও বেশি চীনা গাড়ি কিনেছেন। বাজারে চীনা ব্র্যান্ডগুলোর এই ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ভাবিয়ে তুলেছে প্রতিষ্ঠিত নির্মাতাদের। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পেলে চীনা ব্র্যান্ডগুলো কতটা সফল হতে পারে, তা নিয়ে তাদের উদ্বেগ বাড়ছে।
তথ্যের গোপনীয়তা ও জাতীয় নিরাপত্তা অজুহাতগুলোর যুক্তি অবশ্য প্রশ্নসাপেক্ষ। আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন সংযুক্ত গাড়িগুলো বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করে। কারা সেই তথ্যে প্রবেশাধিকার পাবে এবং কীভাবে তা ব্যবহার করা হতে পারে, তা নিয়ে সরকারের উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তবে এই উদ্বেগ শুধু চীনা নির্মাতাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। গ্রাহকদের তথ্য কীভাবে সংগ্রহ ও ভাগ করা হয়, তা নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছে মার্কিন গাড়ি নির্মাতারাও।.
সম্প্রতি তৃতীয় পক্ষের কাছে গাড়ির তথ্য বিক্রি সংক্রান্ত একটি মামলায় সমঝোতায় পৌঁছেছে General Motors। অন্যদিকে, বিজ্ঞাপন ও তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবহারকারীদের তথ্য ভাগ করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে Lucid Air এবং Tesla Model 3-এর বিরুদ্ধে। তাই তথ্যের গোপনীয়তা কেবল তখনই বড় আশংকার বিষয় হয়ে ওঠে, যখন গাড়ি নির্মাতাটি চীনের—এমন যুক্তি অবাস্তব।
মার্কিন ক্রেতারা এই পরিস্থিতিতে কী পাবেন বা কী হারাবেন, সেটিও বিবেচনা করা দরকার। গাড়ির নির্মাণমান, তথ্যের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় থাকায় এখনো কিছু ক্রেতা চীনা গাড়ি কিনতে আগ্রহী নন। তবে সেই মনোভাব বদলাচ্ছে। সাশ্রয়ী মূল্য এসব গাড়িকে ক্রমেই আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। চীনা নির্মাতারা তুলনামূলক কম উৎপাদন খরচের সুবিধা পায়। ফলে তারা এমন দামে গাড়ি বাজারে আনতে পারে, যার সঙ্গে পাল্লা দেওয়া প্রতিষ্ঠিত মার্কিন ব্র্যান্ডগুলোর জন্য কঠিন হতে পারে।
স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রতিযোগিতা থেকে স্থানীয় নির্মাতা ও গাড়ি শিল্পের কর্মসংস্থান রক্ষা করতে পারে। কিন্তু এর খেসারত দিতে হবে ভোক্তাদের।
চীনা ব্র্যান্ডগুলোকে বাইরে রাখলে কমে যাবে প্রতিযোগিতা, সীমিত হবে ক্রেতাদের জন্য সাশ্রয়ী গাড়ির বিকল্প। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে একটি নতুন গাড়ির গড় দাম প্রায় ৫০,৫৬২ ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬৩ লাখ ২০ হাজার ২৫০ টাকা। গাড়ির মালিকানা যখন ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে, তখন ক্রেতাদের কাছ থেকে সুলভ বিকল্প কেড়ে নেওয়া মোটেও ভোক্তাবান্ধব নীতি নয়।
এছাড়া জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার গাড়ি নির্মাতাদের মতো চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোও যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা স্থাপন করতে পারে। এতে তৈরি হবে স্থানীয় কর্মসংস্থান, আসবে বিনিয়োগ এবং সম্পূর্ণ আমদানির ওপর নির্ভর না করেই মার্কিন ক্রেতারা পাবে তুলনামূলক কম দামে গাড়ি কেনার সুযোগ। অবশ্য এর অর্থ হবে এমন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা, যারা হয়তো আরও কম খরচে গাড়ি তৈরি করতে সক্ষম।
ছবিঃ Geely
তাই এই বিতর্ক শুধু জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে নয়। এখানে মার্কিন কর্মসংস্থান রক্ষা, তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ে যৌক্তিক উদ্বেগ মোকাবিলা এবং গাড়ির দাম প্রতিযোগিতামূলক রাখার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজতে হচ্ছে। অথবা ব্যাপারটি হয়তো আরও সহজ: প্রতিষ্ঠিত গাড়ি নির্মাতারা নিজেদের নিয়ন্ত্রিত বাজার রক্ষা করতে চায়, যাতে প্রতিযোগিতায় না নেমেই ক্রেতাদের কাছ থেকে শেষ পয়সাটুকুও আদায় করা যায়।
ইউরোপজুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে চীনের গাড়ি নির্মাতারা। আর এতে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বড় কয়েকটি গাড়ি নির্মাতা।